রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং সেহরি ও ইফতারের দোয়া

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং রোজা পালনের গুরুত্ব এবং সেহরি ও ইফতারের দোয়া  

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং সেহরি ও ইফতারের দোয়া

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মুসলিম মিল্লাতের উপরে যত অনুগ্রহ এবং রহমত আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন। সমস্ত অনুগ্রহ এবং দানের মধ্য থেকে সব চেয়ে বড় হলো কোরআনুল কারীম। এই কোরআনুল কারীম মুসলমানের জন্য সব চেয়ে বড় সম্পদ। মুসলমানের গর্ভের ধন। এই কোরআন হলো উন্নয়মের চাবিকাঠি। আর এই কোরআনুল কারীম আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে নাজিল করেছেন।আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,রমজানুল কারিম এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে কোরআনকে নাজিল করা হয়েছে। আর এই রমজান মাস হলো কোরআন নাজিলের মাস।

রহমত, মাগফেরাত আর নাজাতের বার্তা নিয়ে পবিত্র মাহে রমজান বর্ষপরিক্রমায় প্রতিবছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে অন্যান্য মাস অপেক্ষা রমজান মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অসীম। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ মাসকে “শাহরুল্লাহ” তথা আল্লাহর মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এ মাসে রোযা পালনকারীকে স্বীয় মেহমানের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। তাই এ মহিমান্বিত মাসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও গুরুত্বকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা প্রতিটি মুমিনের উপর একান্ত অপরিহার্য।

যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন :—
أتاكم رمضان شهر مبارك
তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন :—
فرض الله عز وجل عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب السماء، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه مردة الشياطين، لله فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. رواه النسائي
আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। বর্ণনায় : নাসায়ি
আমাদের কর্তব্য : আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা।কোন মানুষ যদি এই মাসে ভালো কাজ করতে চায়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার ঐ ভালো কাজ করার জন্য সমস্ত উপায় সহজ থেকে সহজ করে দেন।
রমজান মাস ইমানদাদের জন্য ক্ষমা লাভের মাস জাহান্নাম থেকে বাচার এক বিশাল অফার এর মাস।
আল্লাহ তায়ালায় পক্ষ থেকে দেওয়া সারা বছরের শ্রেষ্ট অফার এর মূহুর্ত রমজানুল কারীমের মূহূর্ত। হাদিস শরিফে আসছে আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে প্রতিদিন বহুসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরুয়ানা জারি করে থেকেন।

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কোরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কোরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল-কোরআনই নয় বরং ইবরাহিম আ.-এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। (সহি আল-জামে)

এই রমজান মাসের ফজিলত অনেক, আর এই ফজিলত পবিত্র কোরান শরীফ, হাদিস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পার’: আল কুরআন। ‘রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়ে বেশী ঘ্রানযুক্ত’: আল হাদিস।
রমজান সামাজিক সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব বোধ সৃষ্টি করে’। ‘রমজান আল্লাহ ও বান্দার মাঝে নিতান্ত গোপন ইবাদত তাই এর মাধ্যমে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়,রমজান আল্লাহর ইবাদতের এক অভূতপূর্ব ট্রেনিং স্বরূপ’।

হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বনি আদমের প্রতিটি আমলের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি হতে থাকে, ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ, এমনকি আল্লাহ চাইলে তার চেয়েও বেশি দেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তবে রোজার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, রোজা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি স্বয়ং এর প্রতিদান দিব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ : এক. ইফতারের মুহূর্তে দুই. রবের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্তে। আর রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম। সহিহ মুসলিম হাদিস : ১১৫১

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রোজা এবং কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন দুজনের সুপারিশই গ্রহণ করা হবে। — মুসনাদে আহমদ হাদিস : ৬৫৮৯; তাবরানি, মাজমায়ু যাওয়াইদ ৩/৪১৯

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রোজা হচ্ছে ঢাল।   যখন তোমাদের কেউ রোজা থাকে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে এবং মূর্খের ন্যায় কাজ না করে। কেউ যদি গালি দেয় বা ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয় তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার। সহিহ বুখারি হাদিস : ১৯০৪; সহিহ মুসলিম হাদিস : ১১৫১

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে – হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আনসারি মহিলাকে বললেন, “রমযান মাস এলে তুমি ওমরা করবে।কেননা এ মাসের উমরা একটি হজ্বের সমতূল্য।” (সহীহ বুখারী, হাদীস – ১৭৮২, মুসনাদে আহমেদ, হাদীস – ৩০৯৮)

আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে মুসলিম উম্মাহর জন্য এই মাসে আরেকটি বিশেষ দান হলো,এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী লাইলাতুল কদর। এই রজনী এত মর্যাদাপূর্ণ যে, এক হাজার মাস ইবাদাত করলেও যে সওয়াব হতে পারে,লাইলাতুল কদরের ইবাদাতে তার চেয়ে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।তাই এই রাতের কল্যাণ হতে বঞ্চিত হওয়া চরম দূর্ভাগ্যের বিষয়।আল্লাহ তা’আলা এ রাত সম্পর্কে এরশাদ করেছেন –
“লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ জিবরাইল (আঃ) পৃথিবীতে অবতারণ করেন তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে সকল কল্যাণময় বস্তু নিয়ে। যে রাত পুরোটাই শান্তি, যা সুবহে সাদিক পর্যন্ত অব্যহত থাকে। (সূরা কদর, আয়াতঃ ৩-৫)

রমজান মাসের ফজিলত বলে শেষ করা যাবে না।মহান প্রভুর দরবারে কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনা, তিনি যেনো আমাদের সকলকে রমজান থেকে শিক্ষা লাভ করে; রমহত, মাগফিরাত ও নাজাতের অধিকারী করেন। আমীন!

মুসলমান রোজাদার ব্যক্তিদের সুবিধার্থে সেহেরি ও ইফতারের দোয়াটি নিচে দেয়া হলো-

★ সেহরির  দোয়া:

نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقبل منى انك انت السميع العليم.
বাংলায় উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি, ফারদ্বাল্লাকা ইয়া আল্লাহ ফাতাকাব্বাল মিন্নী ইন্নাকা আনতাস সামীউল আলীম।
বাংলায় অর্থ: হে আল্লাহ পাক! আপনার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকালের রমাদ্বান শরীফ-এর ফরয রোযা রাখার নিয়ত করছি। আমার তরফ থেকে আপনি তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা , সর্বজ্ঞাত।
** কেউ যদি ছুবহি ছাদিক্বের পূর্বে নিয়ত করতে ভুলে যায় তাহলে তাকে দ্বিপ্রহরের পূর্বে নিয়ত করতে হবে। তখন এভাবে নিয়ত করবে:
نويت ان اصوم اليوم من شهر رمضان المبارك فرضا لك يالله فتقبل منى انك انت السميع العليم.
বাংলায় উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমাল ইয়াওমা মিন শাহরি রমাদ্বানাল মুবারকি ফারদ্বাল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফা তাক্বাব্বাল মিন্নী ইন্নাকা আংতাস সামীউল আলীম।

★ ইফতারের দোয়া:


اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ وَ اَفْطَرْتُ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِيْمِيْن

বাংলায় উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন"
বাংলায় অর্থ: হে আল্লাহ পাক! আমি আপনারই সন্তুষ্টির জন্য রোযা রেখেছি এবং আপনারই দেয়া রিযিক্ব দ্বারা ইফতার করছি।

Post a Comment

0 Comments